চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মধ্য মাদারশা সমিতির হাট এলাকার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘হজরত আকবর শাহ (রহঃ) সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসা’-র গভর্নিং বডির সভাপতি নির্বাচন নিয়ে তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি গেজেট ও বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বর্তমান সভাপতি মো. আজমকে টানা তৃতীয়বারের মতো একই পদে বসানোর জন্য জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি একটানা দুইবারের বেশি সভাপতি পদে থাকতে না পারলেও, এখানে এক রহস্যময় রাজনৈতিক আঁতাতের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল নবীর ছেলে মো. আজম ইতিমধ্যে ওই মাদ্রাসার টানা ২ (দুই) বার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ গেজেটের ১২ নম্বর প্রবিধানের (৩) উপ-ধারায় উল্লেখ রয়েছে— “কোনো ব্যক্তি একই বেসরকারি মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটিতে একাদিক্রমে ২ (দুই) বারের অধিক সভাপতি মনোনীত হইতে পারিবেন না, তবে এক মেয়াদ বিরতিঅন্তে তিনি পুনরায় মনোনীত হইতে পারিবেন।” কিন্তু এই আইনি বাধ্যবাধকতাকে সম্পূর্ণ তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার দাপটে মো. আজম পুনরায় তৃতীয় মেয়াদে সভাপতি হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে গত জানয়ারির ৫ তারিখ একটি এডহক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যার মেয়াদ ৬ মাস। এই এডহক কমিটির মূল দায়িত্ব ছিল বিধিমোতাবেক নিয়মিত কমিটি গঠন করা। তবে অভিযোগ উঠেছে, নিয়মিত ও গণতান্ত্রিক উপায়ে কমিটি গঠন না করে একটি পকেট কমিটি তৈরির প্রক্রিয়া চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক আদর্শে আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত মো. আজমকে এই অবৈধ পদে পুনর্বাসিত করতে পর্দার আড়াল থেকে মূল ভূমিকা রাখছেন চট্টগ্রামের স্থানীয় এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতা আকবর আলী। নিজেকে বর্তমান সরকারের ‘মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন’ পরিচয় দিয়ে বিএনপি নেতা আকবর আলী ক্ষমতার দাপট ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে এই অনৈতিক কাজটি বাস্তবায়ন করছেন। আর এই সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিধি-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে সরাসরি সায় দিয়ে মদদ জোগাচ্ছেন খোদ মাদ্রাসার সুপার , যিনি এডহক কমিটির সদস্য সচিব।

সাধারণত নিয়ম অনুযায়ী কমিটির সদস্যদের গণতান্ত্রিক ভোট বা মতামতের ভিত্তিতে এবং বিধিমালা মেনে যোগ্য সভাপতি নির্বাচন করার কথা থাকলেও, এবার সেই নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষক, অভিভাবক এবং ম্যানেজিং কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশা বিরাজ করছে।
মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মো. হানিফ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা এই প্রকাশ্য অনিয়ম ও সরকারি গেজেট লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে যখন প্রতিবাদ জানাই, তখন শিক্ষা কর্মকর্তা মোসলেহ উদ্দিন আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে— এই পদ নাকি মন্ত্রী মহোদয়ের পছন্দের লোককে দেওয়া হবে। এরপর আমরা নিরুপায় হয়ে বিএনপি নেতা আকবর আলীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি আমাদের ধমকের সুরে বলেন— যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবেই করতে হবে, এর বাইরে আর কোনো কথা শুনতে চাই না।”অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্তদের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করা হলেও, বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা জানান, একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এভাবে প্রকাশ্য রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার দাপট এবং সরকারি আইন লঙ্ঘন করে পকেট কমিটি গঠন করা হলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ সম্পূর্ণ বিনষ্ট হবে। তারা অবিলম্বে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং এই অবৈধ প্রক্রিয়া বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছেন।