সাংবাদিক মোঃ কামাল উদ্দীনের ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেন যে,
“আমি কি সত্যিই ইয়াবা ব্যবসায়ী? ”এই সাংবাদিককে মিথ্যা ইয়াবা মামলায় ফাঁসানোর অন্তরালের ভয়ংকর কাহিনী সত্যিই দুঃখজনক। সাংবাদিক মো.কামাল উদ্দিনের মতে জীবনের দীর্ঘ পথচলায় মানুষ অনেক অপবাদ সহ্য করে। কেউ শত্রুতার কারণে অপমান করে, কেউ হিংসা থেকে কুৎসা রটায়, আবার কেউ ক্ষমতার দম্ভে নিরীহ মানুষকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু একজন সাংবাদিকের জীবনে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হলো—সত্য বলার অপরাধে তাকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা।
আজ আমি সেই কথাই লিখতে বসেছি।

এই লেখাটি কোনো কল্পকাহিনি নয়। এটি আমার জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। এমন এক সময়ের ইতিহাস, যখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি ভয়ঙ্কর পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছিল। যখন আইন ছিল ক্ষমতাবানদের হাতিয়ার, আর মিথ্যা মামলা ছিল সত্যবাদী মানুষকে স্তব্ধ করার সবচেয়ে সহজ অস্ত্র।

আজ যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে একটি পিসিপিআর (Personal Case Profile Record) ছড়িয়ে আমাকে “ইয়াবা ব্যবসায়ী” সাজানোর অপচেষ্টা করছে, তারা শুধু একটি কাগজ দেখাচ্ছে। কিন্তু সেই কাগজের পেছনের ভয়ংকর ষড়যন্ত্র, তদন্ত, আদালতের সিদ্ধান্ত, পুলিশি চাঁদাবাজি এবং একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস তারা গোপন করছে।

তাই আজ আবারও আমি সত্য লিখতে বাধ্য হলাম।
আমি মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন। একজন সাংবাদিক, গবেষক, লেখক ও টেলিভিশন উপস্থাপক। প্রায় তিন যুগ ধরে আমি কলম হাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখে যাচ্ছি। এই দীর্ঘ সময়ে আমি অসংখ্য দুর্নীতি, সন্ত্রাস, রাজনৈতিক অপকর্ম, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। আর সেই কারণেই আমার জীবনে এসেছে অসংখ্য মামলা, হামলা, হুমকি, অপপ্রচার এবং মৃত্যুর ভয়।

আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার ইতিহাস নতুন নয়।
১৯৯৭ সালে পাঁচলাইশের বহুল আলোচিত দুবাইওয়ালা সালাম অপহরণ মামলায় আমাকে জড়ানো হয়েছিল। পরে সেই মামলার ভিত্তিহীনতা প্রমাণিত হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল আমার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিয়েছে। রাউজানের ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী আজিম মোহাম্মদের গুমের ঘটনায় আমাকে জড়ানো হয়। রাউজানে চাঁদাবাজির মামলাও দেওয়া হয়। সাতকানিয়ার এক ঘটনায় অপহরণ মামলার আসামিও করা হয় আমাকে। এমনকি প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণে আমাকে হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছিল।

কিন্তু আল্লাহর রহমতে এবং সত্যের শক্তিতে আমি কখনো পরাজিত হইনি। কারণ মিথ্যা যত শক্তিশালী হোক, সত্য শেষ পর্যন্ত মাথা তুলে দাঁড়ায়।
তবুও আমার জীবনের সবচেয়ে অপমানজনক ও ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ছিল ২০১৪ সালের সেই তথাকথিত “ইয়াবা মামলা”।
সময়টা ছিল ২০১৪ সালের জুন মাস। আওয়ামী লীগ তখন দ্বিতীয়বারের মতো বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। চারদিকে এক অদৃশ্য ভয় কাজ করছিল। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে যাচ্ছিল। সাধারণ মানুষ থানায় যেতে ভয় পেত। সাংবাদিকরা সত্য লিখতে আতঙ্ক অনুভব করতেন। কারণ তখন কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতেন।

বিশেষ করে ঢাকার কিছু ডিবি কর্মকর্তা তখন এক ভয়ংকর সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছিল।
তাদের কাজ ছিল—মানুষকে ধরে এনে অবৈধভাবে আটকে রাখা, পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা, টাকা না দিলে মাদক মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া। তখন সবচেয়ে সহজ অস্ত্র ছিল “ইয়াবা”। পকেটে কয়েকশ পিস ইয়াবা ঢুকিয়ে দিলেই একজন মানুষ রাতারাতি “মাদক ব্যবসায়ী” হয়ে যেত।

মিন্টো রোডের ডিবি অফিসের “আয়নাঘর” তখন আতঙ্কের প্রতীক। মানুষ সেখানে ঢুকতো, কিন্তু কবে বের হবে, আদৌ বের হতে পারবে কিনা—তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।
এই ভয়ংকর সময়েই ঘটে আমার জীবনের সেই ঘটনা।
সম্ভবত জুন মাসের ১ বা ২ তারিখ হবে। রমজান মাস। বিকেলের দিকে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। আমি তখন চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার সামনে সাত্তার ম্যানশনে একটি বৈঠকে বসেছিলাম। সেখানে রাউজান উপজেলার তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ সাহেবের অফিসে আমরা কিছু বিষয়ে আলোচনা করছিলাম।
হঠাৎ আমার মোবাইলে ফোন আসে।
ফোন করেছিলেন ঢাকায় আমার সময়ের আলোর প্রতিনিধি মুজিবুর রহমান চৌধুরী। কণ্ঠে ছিল উদ্বেগ। তিনি আমাকে বললেন, “ভাই, একটা বড় সমস্যা হয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়ার আবুল কালাম সিকদারকে ঢাকা ডিবি কয়েকদিন ধরে আটক করে রেখেছে। পরিবার থেকে অনেক টাকা নেওয়ার পরও ছাড়ছে না।”
আবুল কালাম সিকদারকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। তিনি ওমরাহ হজের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বহুবার চট্টগ্রামে এসেছেন। সদ্য বিয়ে করেছিলেন। তার স্ত্রী ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা। ভদ্র, শান্ত একটি পরিবার।
মুজিব আমাকে বললেন, “ডিবি আরো বিশ লাখ টাকা চাইছে। না দিলে নাকি বড় মামলা দেবে।”

আমি মানবিক জায়গা থেকে বিষয়টি জানতে চাইলাম। কারণ আমি বিশ্বাস করি—কেউ অপরাধী হলে তাকে আদালতে পাঠানো হবে। কিন্তু কোনো মানুষকে অবৈধভাবে আটকে রেখে চাঁদাবাজি করা আইন হতে পারে না।
আমি ঢাকার ডিবি অফিসে ফোন দিলাম।
প্রথমে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইল। পরে আমি স্পষ্টভাবে বললাম, “লোকটি যদি অপরাধী হয়, তাহলে নিয়মিত মামলা দিন। কিন্তু তার পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ কেন আসছে?”
আমার এই প্রশ্ন যেন তাদের অহংকারে আগুন ধরিয়ে দেয়।
তারা আমার পরিচয় জানতে চায়। আমি সাংবাদিক পরিচয় দিলে তাদের আচরণ আরো রূঢ় হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ পর তারা ফোন কেটে দেয়।

কিন্তু সেখানেই ঘটনা শেষ হয়নি।
কিছুক্ষণ পর আবার ফোন আসে। এবার তারা উল্টো আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে—আমি কেন আবুল কালামের বিষয়ে কথা বললাম, আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক কী, আমি কার হয়ে কথা বলছি।
আমি তখন স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, “আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছি। আপনারা যদি আইন অনুযায়ী কাজ করেন, তাহলে সমস্যা কোথায়?”
এই কথাগুলোই ছিল আমার “অপরাধ”।
এরপর শুরু হয় ভয়ংকর প্রতিশোধ।
পরে একটি সাজানো নাটকের মতো মামলা তৈরি করা হয়। বলা হয়—ফকিরাপুল এস আলম বাস কাউন্টারের সামনে অভিযান চালিয়ে আবুল কালাম সিকদারকে ২১১ পিস ইয়াবাসহ আটক করা হয়েছে। আর আমি নাকি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেছি!
ভাবুন একবার—আমি তখন চট্টগ্রামে অবস্থান করছি। অথচ মামলার এজাহারে আমাকে ঢাকায় উপস্থিত দেখানো হলো। প্রযুক্তি ব্যবহার করলে, মোবাইল কল রেকর্ড দেখলে, লোকেশন ট্র্যাক করলে সহজেই প্রমাণ হয়ে যেত আমি ঢাকায় ছিলাম না। কিন্তু সত্য খোঁজা তখন উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল ভয় দেখানো, অপমান করা এবং একজন সাংবাদিককে থামিয়ে দেওয়া।
পরে মতিঝিল থানার পক্ষ থেকে আমার বিরুদ্ধে একটি পিসিপিআর তৈরি করে বোয়ালখালী থানায় পাঠানো হয়।

গ্রামের একজন পরিচিত মানুষের মাধ্যমে আমি খবর পাই—আমার নামে ইয়াবা মামলা হয়েছে।
আমি হতবাক হয়ে যাই।
একজন সাংবাদিক, যিনি সারা জীবন মাদকের বিরুদ্ধে লিখেছেন, সমাজের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন—তাকেই “ইয়াবা ব্যবসায়ী” বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে!
আমি সঙ্গে সঙ্গে বোয়ালখালী থানার অফিসার ইনচার্জের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এরপর মামলার কাগজ সংগ্রহ করি। কাগজ হাতে নিয়ে আমি বুঝতে পারলাম—এটি শুধু একটি মামলা নয়, এটি পরিকল্পিত প্রতিশোধ।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—চুপ থাকবো না।
আমি আইজিপি, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, স্বরাষ্ট্র সচিব, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও লিখিত অভিযোগ দিই। আমি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরি কীভাবে একটি চাঁদাবাজ চক্র মানুষকে ইয়াবা মামলায় ফাঁসাচ্ছে।
আমার অভিযোগের ভিত্তিতে একটি যৌথ তদন্ত টিম গঠন করা হয়। সেখানে পুলিশ, সিআইডি এবং অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তারা ছিলেন। তদন্তের নেতৃত্বে ছিলেন গুলশান বিভাগের তৎকালীন সিনিয়র উপ-পুলিশ কমিশনার ফেরদৌস কামাল।
দীর্ঘ তদন্ত শুরু হয়।
তদন্তে একের পর এক ভয়ংকর তথ্য বেরিয়ে আসে। প্রমাণ পাওয়া যায়—ডিবির কিছু সদস্য সত্যিই অবৈধভাবে মানুষ আটক করে টাকা আদায় করতো। ইয়াবা মামলা ছিল তাদের ব্যবসার অংশ। তদন্তে আরো উঠে আসে—আমাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেখানোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই।
বরং তদন্তে স্পষ্ট হয়ে যায়—আমাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে।
ডিবির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ডিবি ইন্সপেক্টর হুমায়ুনের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একপর্যায়ে তাদের চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়।
যখন তারা বুঝতে পারে সত্য প্রকাশ হয়ে গেছে, তখন তাদের আচরণ পাল্টে যায়।
তারা বিভিন্ন মাধ্যমে আমার সঙ্গে আপোষ করার চেষ্টা করে। কেউ কেউ ক্ষমাও চায়। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল—একজন সাংবাদিককে মিথ্যা ইয়াবা মামলায় ফাঁসানো সহজ নয়, যদি তিনি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে লড়াই করেন।
অবশেষে আমাকে চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়।
পরে আদালত পুরো মামলাটিকেই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন হিসেবে খারিজ করে দেন। ফলে আবুল কালাম সিকদার, মুজিবুর রহমানসহ সবাই মুক্তি পান।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ এত বছর পরও কিছু মানুষ সেই পুরোনো পিসিপিআর কাগজ ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। কারণ আমি এখনো লিখি। আমি এখনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি। আমি এখনো সত্যকে ভয় পাই না।
আজ আমি প্রকাশ্যে ঘোষণা করছি—আমার এই লেখার একটি শব্দও যদি কেউ মিথ্যা প্রমাণ করতে পারেন, আমি তাকে ১০ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেব।
আমি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি—এই পুরো ঘটনাটি পুনরায় তদন্ত করা হোক। যারা মিথ্যা মামলা দিয়ে মানুষকে হয়রানি করেছে, যারা আজও অপপ্রচার চালাচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।
কারণ একজন সাংবাদিককে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়তো কিছু সময়ের জন্য হয়রানি করা যায়, কিন্তু সত্যকে কখনো হত্যা করা যায় না।
আমি আজও সেই সত্যের পথেই আছি। আমার কলম আজও বিক্রি হয়নি। আমার বিবেক আজও মাথা নত করেনি। আর যতদিন বেঁচে থাকবো, সত্যের পক্ষেই লিখে যাবো।
চলবে—