বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ হলো আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ মঞ্চ। কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে—যেখানে আইন প্রণয়ন হয়, সেখানে আইন বিষয়ে সামান্যতম শিক্ষা ছাড়াই কি কেউ সংসদ সদস্য হওয়া উচিত? বাস্তবতা হলো, আমাদের জাতীয় সংসদে শুধু স্নাতকোত্তর বা উচ্চশিক্ষিতই নয়, অর্ধশিক্ষিত এমনকি একেবারে অশিক্ষিত ব্যক্তিরাও “গণতন্ত্রের দোহাই” দিয়ে সংসদে প্রবেশ করছেন। এ প্রসঙ্গে এক সাংবাদিকতা কর্মশালায় প্রেস কাউন্সিলের একজন সম্মানিত সদস্য বলেছেন—“ডিগ্রি পাস ছাড়া সাংবাদিকতা করা যাবে না।” এই বক্তব্যটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। কারণ, সাংবাদিকতা এমন এক পেশা
যেখানে কেবল ডিগ্রি থাকলেই কেউ সফল সাংবাদিক হয়ে উঠবেন—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা, সত্যের অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই এবং কলমের নির্ভীকতা—এসবই একজন সাংবাদিকের আসল পরিচয়।
সাংবাদিকতায় শিক্ষার আসল মানদণ্ড
আমরা জানি, ডাক্তারি বা আইনপেশায় যোগ দিতে হলে নির্দিষ্ট ডিগ্রি প্রয়োজন। কিন্তু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। কেউ যদি একেবারে পাঠশালার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তথ্যভিত্তিক, নির্ভীক এবং যুক্তিপূর্ণ লেখালেখি করতে পারেন—তাহলে তাকেও সাংবাদিক বলা যায়। তবে একটি মৌলিক শর্ত রয়েছে—সাংবাদিককে অবশ্যই অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। অক্ষর না জানা অবস্থায় সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। আজ আর কেউ সাহস করে সাংবাদিককে অশিক্ষিত বলতে চান না। যদিও বাস্তবে অনেক সময় শিক্ষাগত দুর্বলতার কারণে সাংবাদিকদের ভুলভ্রান্তি দেখা যায়। তবুও মনে রাখতে হবে—ভালো সাংবাদিক হতে হলে নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে, কেবল ডিগ্রি থাকলেই হবে না।
সাংবাদিক সংগঠন নিয়ে বিভ্রান্তি
আরেকটি ভুল ধারণা হলো—সাংবাদিক সংগঠনের সাথে যুক্ত না থাকলে কেউ সাংবাদিক হতে পারবেন না। এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। সংগঠনের সাথে থাকা মানে ঐক্যবদ্ধ থাকা, কিন্তু সাংবাদিকতার মূল যোগ্যতা নির্ধারণ করে না কোনো সংগঠনের সদস্যপদ। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক বড় বড় সাংবাদিক নেতা আছেন যারা নিয়মিত লেখেন না, কিংবা কোনো নতুন তথ্য উপস্থাপন করেন না। আবার এমন নেতাও আছেন যারা সাংবাদিকতা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় চলে গিয়েছেন, কিন্তু এখনও নামধারী সাংবাদিক নেতা হিসেবে পরিচিত।
অপসাংবাদিকতার বিপদ
সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা—“হলুদ সাংবাদিকতা” বা “অপ-সাংবাদিকতা” আমাদের পেশাকে কলঙ্কিত করছে। নামধারী, ধান্দাবাজ, সুযোগসন্ধানী এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের থেকে সাংবাদিক সমাজ ও পাঠকদের সাবধান থাকতে হবে। সত্যিকারের সাংবাদিক সেই, যিনি নির্ভীকভাবে তথ্যনির্ভর লেখালেখি করেন এবং সমাজকে আলোকিত করেন। লেখকের আত্মসমালোচনা- আমি কাউকে ছোট করার উদ্দেশ্যে এসব লিখিনি। আমি নিজেও স্বীকার করি—আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা তেমন উঁচু নয়, কিন্তু আমি শিখতে চাই, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা “সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা” নামের একটি গ্রন্থ আসন্ন বইমেলায় প্রকাশের অপেক্ষায় আছে।
সবশেষে বলা যায়—সংসদ হোক বা সাংবাদিকতা, প্রকৃত যোগ্যতা নির্ভর করে জ্ঞান, সততা, দায়িত্ববোধ ও নিরলস চর্চার ওপর। ডিগ্রি নয়, আসল পরীক্ষা হয় কাজের মাধ্যমে